সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২০

প্রগতিশীল মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দৃষ্টিতে পোশাক

  • জিয়া আল হায়দার
  • ২০২০-১০-১১ ২৩:৪২:৪৮
image

পোশাক আইডেন্টিটি নির্ধারক সাংস্কৃতিক উপাদান, কাজেই অবচেতনে সমাজ আমাদের পোশাক ঠিক করে দেয়। প্রগতিশীল মৌলবাদীরা বলে, পোশাক কোন সমস্যা না। আমি কি পরেছি, কি করেছি সেটা আমার দোষ না। সমস্যা পোশাকে নয় দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমি নিয়ন্ত্রিত পোশাক পরবো না; আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। ইত্যাদি।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় পোশাক নিয়ে তাদের কোনো হেডেক নাই। আসলে পোশাক নিয়ে সবচেয়ে বড় হেডেক ধর্মান্ধ মৌলবাদীর চেয়ে প্রগতিশীল মৌলবাদীদের আরো বেশি। তা না হলে তারা বোরখা পরিহিতা ক্রিকেট খেলা রত মায়ের পোশাক নিয়ে বিশ্রী কান্ড ঘটাতো না। নাটকে, সিনেমায়, পত্রপত্রিকায়, বিজ্ঞাপনে, বিলবোর্ডে নারীকে উত্তেজক পোশাক পরিধান করাতো না। অনুত্তেজক সাধারন ও সারা শরীর ঢাকা পোশাকেই তারা নাটক-সিনেমা বিজ্ঞাপন বানাতো। তারা নারীদের স্বাভাবিক পোশাক ছোট করতে করতে নারীদের স্বল্প বসনা করে প্রায় উলঙ্গ করে দিত না। ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের যেমন ছোট পোশাকে সমস্যা, তেমনি ঠিক নারীবাদী মৌলবাদীদের বড় পোশাকে সমস্যা। এজন্যই এরা পর্দার বিরুদ্ধে খুব ক্ষ্যাপা। অথচ পর্দা পোশাকের একটা প্রকরণ মাত্র। এটা পোশাকের বাইরে আলাদা কিছু না। শীতের সময় যেভাবে মানুষ সবকিছুকে ঢেকেঢুকে রাখে সেটাকে তখন পর্দা বলা হয় না; ঠিক তেমনি পর্দা এক ধরনের পোশাকী অভিরুচি। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে বড় পোশাকের কারণে যখন মেয়েদের অপমান করা হয়; তখন সেটা প্রগতিশীল মৌলবাদীদের একটা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী আচরণ এবং পোশাক সংক্রান্ত অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। তারমানে বড় পোশাকে ওদের সমস্যা। হ্যাঁ, একটা নারীর রূপ রঙ-ঢঙ চলন বলন কথন ইশারা ইঙ্গিত বুক পিঠ নিতম্ব নাভী দেখতে না পারা এটা হচ্ছে ওদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রগতিশীল মৌলবাদীদের পোশাক নিয়ে যদি কোন সমস্যা না থাকে, তাহলে শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গ প্রদর্শন ছাড়া সাধারণ পোশাকে কেউ নায়িকা হয় না কেন? তারমানে হুজুররা যেমন নারীকে পর্দায় ঢেকে দিতে চায়; ঠিক তেমনি প্রগতিশীল মৌলবাদিরা নারীর সর্বাঙ্গ ঢাকা পড়ে থাকে, শারীরিক কাঠামো স্পষ্ট হয় না; এমন পোশাক কেড়ে নেয়। মাথাব্যথা উভয় পক্ষের।

ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ছোট পোশাকে সমস্যা। প্রগতিশীল মৌলবাদীদের বড় পোশাকে সমস্যা। নারী ও পুরুষ পরস্পরের কাছে আকর্ষণের বিষয়‌। এই আকর্ষণটা নৈতিক মানদণ্ডে অনুত্তীর্ণ পুরুষের কাছে শুধুমাত্র জৈবিক ক্ষুধা হয়ে উঠে তখন; যখন সে স্বল্প বসনা নারীকে দেখে। নারীর স্পর্শকাতর অঙ্গভঙ্গিতে নড়েচড়ে উঠে না, এটা কেউ দাবি করতে পারবে না। কাজেই নগ্নতা পুরুষের ভিতর একটা সুড়সুড়ি তৈরি করে। যারা এসব থেকে বিরত থাকে এবং শক্তিশালী নৈতিক অনুশাসন মেনে চলে তাদের কথা ভিন্ন। যারা এসব নিয়েই উঠাবসা করে এবং যাদের সার্কেলে এসব অশ্লীলতা উন্মুক্তভাবে চর্চা হয় তারা সেখান থেকে জৈবিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়। এখন এর সাথে যখন ক্ষমতা যোগ হয় তখন সে তার এই পাশবিক ইচ্ছাপূরণে হাতের নাগালে যাকে পায় তার উপর হামলে পড়ে। আর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা তাকে লজ্জাহীন শঙ্কাহীন এবং আইন আদালতের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল করে তোলে। সে ধর্ষণ ঘটায়। কাজেই ধর্ষণের সুড়সুড়ি দেয়ার জন্য এবং ধর্ষণে একজন নীতি-নৈতিকতাহীন নগ্ন অশ্লীল সংস্কৃতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত যুবককে উদ্বুদ্ধ করার জন্য অনলাইনে অফলাইনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা উত্তেজক পোশাক এবং নগ্নতা- অশ্লীলতার ভূমিকা অবশ্যই আছে। 

এরপর ক্ষমতা এবং দাপট থাকলে সেটি তার ইচ্ছে থেকে অন্য নারীর উপর প্রয়োগ হয়। একটা জাতীয় পত্রিকায় একবার ইন্ডিয়ান এক নায়িকার উদ্যেম পেটের একটা ছবি ছাপানো হয়েছিল। একই দিন ঐ পত্রিকার নিচের কলামে আরেকটি নিউজ এসেছে শিশু ধর্ষণের। আমি বিভাগীয় সম্পাদক কে ফোন করলাম। বললাম; আজকের পত্রিকার এই পৃষ্ঠা টা হাতে নেন। আপনি যেই ছবিটা ছেপেছেন এই  ছবিটা একটা জাতীয় পত্রিকায় ছাপার উপযুক্ত কিনা? এই ছবি সংবলিত পত্রিকা ফ্যামিলির কমনরুমে রাখার মত কিনা? এবার দেখেন এই ছবির প্রভাব কোথায় পড়ে- ওই ছবির ক্যাপশন ছিল "হট প্রিয়াঙ্কা" আমি বললাম হট প্রিয়াঙ্কাকে দেখিয়ে  যখন যুবককে আপনি হট করে দিলেন সে তখন প্রিয়াঙ্কাকে না পেয়ে সামনে যারে দুর্বল পাইছে তার উপর জোরপূর্বক জৈবিক চাহিদা এপ্লাই করছে (এটা অবশ্যই অপরাধ) তখন এর উদ্বুদ্ধকারী হিসেবে তো আপনি দায়ী। আপনি হট হট ছবি দিয়ে তরুণদেরকে হট করে তোলেন আবার আপনারাই ধর্ষণের বিরুদ্ধে নিউজ ছাপেন! ধর্ষণ তো আপনারাই বৃদ্ধি করেন। তাকে আমি আরো যে ওয়াজ সেদিন দিয়েছিলাম; "সংবাদপত্র হচ্ছে জাতির দর্পন। এই দর্পণ জাতিকে পথ দেখাবে। একটি সুন্দর চরিত্রবান মনুষ্যসমাজ গঠন করবে। কিন্তু আপনারা যদি এভাবে হট প্রিয়াংকার ছবি ছাপান, এই ছবি দেখে তো চরিত্রবান হওয়া কিংবা হট না হওয়ার কোন উপায় নাই!

আমি বেচারাকে সেদিন হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। যুক্তি মেনে হোক কিংবা পাঠক হিসেবে সৌজন্যতা রক্ষা করে হোক সেদিন সে স্বীকার করেছিল; ওই ছবি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশের অনুপযুক্ত এবং একসাথে ফ্যামিলিতে বসে পড়ার মত ছিল না। এবং সে আমাকে সরি বলেছিল। কমিটমেন্ট করেছিল ভবিষ্যতে এমন ছবি ছাপানোর ক্ষেত্রে সে সতর্ক থাকবে।

সুতরাং ধর্ষনে উদ্বুদ্ধ করে এবং সুড়সুড়ি প্রদানের ক্ষেত্রে নগ্নতা এবং উত্তেজক স্বল্প পোশাক অবশ্যই দায়ী। যারা এটা মানে না; তারা মিথ্যুক অথবা নপুংসক।

নগ্নতা অশ্লীলতা এবং স্বল্প পোশাক যদি ধর্ষনে উদ্বুদ্ধ না করে তাহলে জঙ্গী বক্তব্য শুনে কেউ কখনো জঙ্গি হয় না। জঙ্গী বই পড়ে কেউ কখনো জঙ্গি হয় না।

নারীর উপর যৌন উত্তেজনা প্রশমনের এই পাশবিক নিপীড়নের জন্য জমিনের পেট পিঠ বুক দেখানো তারকারা এবং তাদের পরিচালক প্রযোজক ও পৃষ্ঠপোষকরাও দায়ী। কথা কি ক্লিয়ার?

এবার আসেন আরেকটা আলাপে। প্রগতিশীল মৌলবাদীরা বলে কে কী পোশাক পরবে এটা সমাজ ঠিক করে দিবে না। আমি বলি এটা সমাজ ঠিক করে দিবে। পোশাক আচরণ কর্মকাণ্ড সবকিছু মিলেই একটা সাংস্কৃতিক সমাজ গড়ে ওঠে। আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আমাদের কিছু পোশাক অবশ্যই আছে যেগুলো আমাদের স্বাতন্ত্র সংস্কৃতির বাহন।

লেখক: জিয়া আল হায়দার 

[মতামতের লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব]

 


 

এশিয়ান টাইমস/এমজেডআর


এ জাতীয় আরো খবর