মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৪, ২০২০

বাংলাদেশের ঐতিহ্যে দিনাজপুরের কান্তজী মন্দির

  • আজিজুর রহমান
  • ২০২০-১০-২৭ ১৮:৩৭:২৯
image

ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম জেলা দিনাজপুর। এই জেলাতেই বহুকাল ধরে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কান্তজিউ মন্দির।দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তর ও কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়ন, দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে প্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত।মন্দিরটির কোল ঘেষে বয়ে গেছে একটি নদী।নদীর নামটাও ভারি মজার,ঢেঁপা। শান্ত-স্নিগ্ধ নদী, গাছ-পালা, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিশ্রণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রার পরিবেশ।

কান্তজীউ মন্দির বা কান্তজির মন্দির বা কান্তনগর মন্দির নামে পরিচিত হলেও এটি নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত কারণ তিনতলাবিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিলো। 

মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তার শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যুর পরে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন।তিনতলা বিশিষ্ট মন্দিরটি রাজা গিরিনাথ পরবর্তীতে ব্যাপক সংস্কার করেন।বয়সের হিসাবটা শুনে যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে। কম তো নয়!প্রায় আড়াইশ বছরেরও আগে সেই মোঘল আমলের জমিদার বাবুদের কাজ এটি!

তিনতলা লাল ইটের মন্দিরটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে সমান ভিত্তির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বাইরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে পোড়ামাটির ফলকে লেখা রামায়ণ,মহাভারত থেকে শুরু করে রাজাদের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি।পুরো মন্দিরে প্রায় পনের হাজার টেরাকোটা টালি রয়েছে। মাটিতে খোদাই করা যেসব টালির উপর লেখা বা চিত্র আঁকা হয়, তার নামই টেরাকোটা টালি।

জানা যায়, একতলার ছাদে ৪টি, দোতালার ছাদে ৪টি, আর তিনতলার ছাদে ১টি, মোট ৯টি চূড়া বা রত্ন ছিল। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতাও ছিল ৭০ ফুট।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ মন্দিরের ব্যাপক সংস্কার করলেও মন্দিরের চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয়নি।

উপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে মন্দিরটি। মন্দিরের চারদিকের সবগুলো খিলান দিয়েই ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়। মন্দির প্রাঙ্গন আয়তকার হলেও পাথরের ভিত্তির উপরে দাঁড়ানো ৫০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটি বর্গাকার। মন্দিরের ভিত্তিমূলের দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ৩ ইঞ্চি। ভূমি সমতল থেকে ভিত্তিভূমির উচ্চতা ৩ ফুট। মেঝেতে ওঠার জন্য দুপাশে পাঁচ ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি রয়েছে। মন্দির ভবনের দেওয়ালের দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট এবং আয়তন ৩ হাজার ৬শ’ ফুট। নিচতলার সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। দুটো ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে। স্তম্ভ দুটোতে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর কারুকার্য।

মন্দিরটির পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দা থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে।মন্দিরের নিচতলায় ২১টি এবং দ্বিতীয় তলায় ২৭ টি দরজা-খিলান রয়েছে,তবে তৃতীয় তলায় রয়েছে মাত্র ৩টি করে।পুরো মন্দিরের নির্মাণশৈলীতে মধ্যযুগীয় ধারা খুঁজে পাওয়া যায়।

পর্যটকদের জন্য মন্দিরের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে আকর্ষনীয় রেষ্ট হাউজ। দর্শনার্থীদের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে মিউজিয়াম। কেনা-কাটার সুবিধার্থে পাশেই মার্কেট তৈরি করে এর আশপাশের রাস্তা উন্নয়ন করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী শিব মন্দির ও রাজবেদী সংস্কার করে আমুল পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রবেশ দ্বারে স্থাপন করা হয়েছে তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি স্তম্ভ। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘সিদু কানু’ চত্ত্বর।

কান্তনগরের শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ যেকোনো ভ্রমণপিপাসুর কাছে নিঃসন্দেহে আকর্ষণের। কান্তজীর মন্দির ভ্রমণের বোনাস হিসেবে দেখতে পাবেন ঐতিহাসিক নয়াবাদ মসজিদও।

 

 

এশিয়ান টাইমস্/এমজেডআর


এ জাতীয় আরো খবর