শুক্রবার, আগস্ট ৭, ২০২০

করোনাবার্তা: স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বানিজ্য নির্ভরহীন দুর্নীতি মুক্ত হওয়া আবশ্যক

  • ডাঃ মোঃ ছায়েদুল হক
  • ২০২০-০৬-১৩ ২২:৩১:৩২
image

করোনা মহামারীরতে এক অসহায় বিশ্বকে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। উন্নত অনুন্নত অনেক দেশের বড় বড় শহরে অত্যাধুনিক সব হাসপাতালের আয়োজন দেখে মনে হচ্ছিল আধুনিক চিকিৎসা অনেক দূর এগিয়েছে। সমাজের ধনিকশ্রেনী ও প্রভাবশালী এক দেশ থেকে অন্যদেশে ছুটে গেছেন বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসার জন্যে। মেডিক্যাল টোরিজম জনপ্রিয় এক শব্দ  দ্রুত প্রশারমান এক রাজস্ব খাত। সাধারনের চিকিৎসার মাঝে বিশেষ শ্রেণীগোষ্ঠির জন্য বিশেষ আয়োজন। ক্রমেই সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থাই যেন ঝূকে পড়ছে সামর্থ্যবানদের দিকে। মধ্যবিত্ত এই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা থেকে ক্রমেই ছিটকে পড়তে থাকলো। বাহির থেকে মনে হচ্ছিল স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপি এক অনন্য উচ্চতায় উপনীত।  অথচ হঠাৎ করেই করোণা এসে সমস্ত কিছু উলট পালট করে দিয়ে গেল। করোণার মহামারী না এলে আমরা বুঝতেই পরতাম না বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কতটুকু ভঙ্গুর।উন্নত অনুন্নত সমস্ত দেশের অহংকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে করোণা জানান দিয়ে গেল বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

আমাদের দেশেও অনেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আত্বতৃপ্তির ঢেকুর তোলার চেষ্টা করেছেন।দেশে আধুনিক কিছু চিকিৎসা কোন কোন হাসপাতালে হয়ত সম্ভব হচ্ছে।দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর এক অতি ক্ষুদ্র অংশ হয়ত এর ভূক্তা।এটিকে দিয়ে সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার বিচার করা যাবে না।করোনা সংকটে যখন স্বাস্থ্যসেবার একটা অংশ করোনা রোগীর জন্য নির্ধারিত হয় এবং লকডাউনে পরে উচ্চবিত্তের একটি অংশ যখন এই স্বাস্থ্যসেবা গ্রহনে বাধ্য হয় তখন আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল চিত্রটি সামনে আসতে শুরু করে। ছোট খাট কিছু স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকে খেয়াল করলে আমাদের আভ্যন্তরিণ স্বাস্থ্য সেবার অসহায় চিত্রটি আরও পরিস্কার হবে।

করোনার শুরুতেই দেখা গেল মাস্ক, প্রটেক্টিভ গিয়ার ইত্যাদির সংকট এবং এটি কেবল বাংলাদেশেই নয় বরং বিভিন্ন দেশে দেশে।হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এমন সংকট সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।অস্বস্তিকর হলো এর সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পড়া।যেমন চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে কোন কোন প্রস্তুতকারী দেশ নিজের চাহিদার কথা চিন্তা করে সাময়িকভাবে রপ্তানী বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়ে আমদানীকারক দেশ।করোণা শনাক্ত করনের কিট এবং চিকিৎসা সামগ্রীর বেলায়ও আমরা এটি প্রত্যক্ষ করেছি।বৈশ্বিক লকডাউন এটিকে আরও তীব্র করেছে।চিকিৎসা সামগ্রীর বৈদেশিক নির্ভরতা সংকটকালে কতটা অসহায়ত্বের কারণ হতে পারে তা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম।ভবিষ্যত কর্ম পরিকল্পনায় এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

আবার যখন করোনা সংক্রমনের হাড় বাড়তে থাকলো তখন দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্রপট।করোণার উপসর্গ আছে এমন সব রোগীর চিকিৎসা প্রদানে বিভিন্ন হাসপাতালে বিশেষ করে বেসরকারী হাসপাতালেএক ধরনের নেতিবাচক ভুমিকা পরিলক্ষিত হতে থাকে।অনেক হাসপাতালে করোণা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা প্রদানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম; আলাদা ব্যবস্থাপনা ও  সর্বোপরি প্রটেক্টিভ গিয়ার ও জনবলের ঘাটতি; করোণা শনাক্তকরনের নিজস্ব ব্যবস্থা না থাকা  এমনসব যুক্তিতে রোগীদের চিকিৎসা এড়িয়ে চলার একটা প্রবনতা দেখা দেয়।এতে দেশে জরুরী চিকিৎসায় এক ধরণের নাজুক অব্স্থার সৃষ্টি হয়।সাধারণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য দেশে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি তেমন একটা না থাকলেও ইমারজেন্সী চিকিৎসা যেমন ডায়ালাইসিস, আইসিইউ সাপোর্ট ইত্যাদির বেশ ঘাটতি আছে। এসব ক্ষেত্রে জনবলের ঘাটতিও প্রকট। অনেক হাসপাতালেরই অবকাঠামোগত সমস্যা থেকে শুরু করে জনবল এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদান সিস্টেম অপ্রতুল।অনেক জেনারেল এবং বিশেষায়িত হাসপাতালেই দেখা গেল আধূনিক অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার যথেষ্ঠ ঘাটতি। আধুনিক চিকিৎসার জন্য এগুলি খুবই জরুরী।টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চৎ করা প্রয়োজন। 

করোণা রোগী শনাক্ত করতে গিয়ে এক অভাবনীয় দৃশ্যপটের মুখোমুখি হয় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। সেম্পল কালেকশন বা নমুনা সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ্য জনবলের ঘাটতি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ল্যাবের স্বল্পতা, কিট স্বল্পতা ইত্যাদি বিষয়গুলি প্রকট হয়ে সামনে আসে ।আধুনিক ল্যাব সংকটের সাথে ল্যাব টেকশিয়ানের সংকটটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ করে করোণার মত মহামারীর সময়ে যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। করোনা মোকাবেলায় অনেকগুলি আরটি-পিসিআর ল্যাব বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে বসানো হয়েছে। আরটি-পিসিআর একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। বর্তমানে সংক্রামক জীবানু শনাক্তকরণে, ক্যান্সার চিকিৎসায় ও বিভিন্নরকম জ্বিন থ্যারাপীতে এটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।এটি একটি ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। এর টেষ্টও ব্যয়বহুল। ফলে এটি আমাদের দেশে জনপ্রিয় নয়। তবে যেহেতু সরকারীভাবে অনেকগুলি আরটি পিসিআর মেশিন স্থাপন করা হয়েছে তাই এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির টেষ্টটি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ার সূযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষ করে বায়ো সেফটি মেজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  সামগ্রীকভাবে ল্যাব ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আধূনিক ল্যাব ব্যবস্থাপনাটি বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় যেন সীমাবদ্ব না হয়ে যায় সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।

করোনার মত এমন একটি সংক্রামক ব্যাধির মহামারীর সময়ে অবাক করার বিষয় হলো আমাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলির ভূমিকা খুবই অপ্রতুল। সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞের অনুপস্থিতিও যথেষ্ঠ পীড়াদায়ক।সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ যে কেবল করোণা মোকাবেলায় জরুরী তাই নয়। বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল; জরুরী ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার যেমন ডায়ালাইসিস, আইসিইউ সাপোর্ট ইত্যাদিতে সংক্রমন নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা থাকাটা খুবই জরুরী। সংক্রমাক ব্যাধি প্রতিরোধ ও সংক্রমন নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা ছাড়া একটি আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কোন মতেই কল্পনা করা যায় না। উন্নত দেশগুলি এব্যাপারে যথেষ্ঠ গুরুত্বারোপ করে থাকে। অথচ আমাদের কাছে সংক্রামক ব্যাধির গুরুত্ব একদম নেই বললেই চলে। আমাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলিতে না আছে সংক্রাক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ না আছে নিজস্ব আধুনিক ল্যাব। সামনের দিনগুলিতে সংক্রামক ব্যাধি কমবেশী সবসময় আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। সেই সাথে ক্রিটিক্যাল কেয়ারে সংক্রমন নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়বে বৈ কমবে না। 

বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি যোগোপযোগী সংক্রমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অতীব জরুরী। করোনার ক্রান্তিকালে হয়তো অনেক জীবন অবসান হবে। অনেক আর্থিক ক্ষতি হবে। অনেকেই অনেক দু:সহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। তারপরও আশা করি করোণাকে জয় করে মানুষ ধীরে ধীরে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। 

বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে করোনা উত্তর নতুন প্রেক্ষাপটে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশা পুরণ করতে হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই যোগোপযোগী করে গড়ে তুলার পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে বেসরকারী বা বানিজ্য নির্ভরতার উপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সমস্ত প্রচেষ্টাই মুখ থুবরে পড়বে যদি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে দুর্নীতিমূক্ত করা না যায়। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিকভাবে ঢেলে সাজানোর এটিই সময়।

[লেখক-ডা. মো. ছায়েদুল হক
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক
আইডিয়াল আই কেয়ার সেন্টার লিঃ
৩৮/৩-৪, রিং রোড,আদাবর, ঢাকা।
Mail: sayedul.hq@gmail.com]

 

 

এশিয়ান টাইমস্/ এএসএস


এ জাতীয় আরো খবর