রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২০

করোনা জয়ের গল্প

  • মানিক মুনতাসির
  • ২০২০-০৬-১৪ ০২:২৮:৪০
image
ছবিঃ মানিক মুনতাসির- ওয়াশিংটন ডিসিতে তোলা। এ ছবিটা যিনি তুলেছেন তিনিও আজ করোনাক্রান্ত। আল্লাহ তাকে শেফা দান করুন। আমীন।

নিশ্বাসকেই বিশ্বাস করুন! 

"এক সেকেন্ডের নাই ভরসা। বন্ধ হবে রং তামাশা। চক্ষু মুদিলে, হায়রে দম ফুরাইলে"।

এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় বাংলা গান। ৯০ এর দশকে হাইস্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় খালি গলায় গানটি গেয়ে ৫০০ টাকা বকশিস পেয়েছিলাম হেড স্যারের কাছ থেকে। সেটা মনে আছে আজও। 

আমার এক বন্ধু "বর্ণালী" রবীন্দ্র সংগীত আর দেশাত্ববোধক গান গাইতো। এখন সে কোথায় আছে, ঠিক জানি না।" আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি, নাচিবে ঘিড়ি ঘিড়ি, গাহিবে গান"। বর্ণালী এ গানটাও সে খুব গাইতো। 

আহা! সহচরী, সখি, বন্ধু-স্বজন, প্রিয়জন। কতদিন ধরি না হাত। চলি না পাশাপাশি।  নাচি না এক সাথে। গাহি না গান৷ পৃথিবী থেকে এক রকম পালিয়ে আছি সবাই৷ এভাবে পালিয়ে বাঁচা যায় না। বুক ভরে শ্বাসও নেয়া যায় না। নিশ্চিন্তে কিছু খাওয়াও যায় না। বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে ঢাকার ৭০ ভাগ মানুষ ভালভাবে ঘুমাতে পারছে না। 

মূল গল্পঃ ১৯ মে রাত তিনটায় হঠাৎ ঘুম ভেংগে যায়।  এক অজানা আতংকে। মাত্র দু,ঘন্টা আগে ঘুমিয়েছিলাম।  জেগেই মনে হল বুকটা ভার ভার লাগছে। বারান্দায় গিয়ে দীর্ঘ শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করি। ব্যর্থ হই বার বার। চোখ দিয়ে অটো পানি বেরুচ্ছে।  প্রায় আধা ঘন্টা লাগে স্বাভাবিক হতে। ফ্লাস্ক থেকে চা খেলাম। গরম পানি খেলাম। বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুলাম। বারান্দায় বসে থাকলাম গাছগুলোর সাথে অনেক্ষন। ফজরের আযান শুনতে পেলাম। নামাজ পড়ে শুইলাম। কিন্তু ঘুম হল না। কারণ আমি তখন কোভিড-১৯ পজিটিভ। বার বার মাকে মনে পড়ল৷ প্রায় ২২ বছর আগে হারানো বাবার কথা খুব মনে পড়লো।  আর মনে হল এবার কি তাহলে বাবার কাছেই চলে যাচ্ছি। অবুঝ ছেলে দুটো এতিম হয়ে যাবে। আল্লাহর কাছে খুব কাঁদলাম। হালকা কাশিও ছিল। 

ইতিমধ্যে আমার সহধর্মিণীর ঘুম ভেংগে গেছে পাশের ঘরে৷ শব্দ পেলাম ১১ মাস বয়সী ছোট ছেলের। আবার বুকটা হুহু করে উঠল। মনে হল দম বন্ধ হয়ে আসছে। অতপর হালকা ব্যায়াম করলাম। আবার গরম পানি খেলাম। শ্বাসের ব্যায়াম করলাম। ততক্ষণে ছয়টা বেজে গেছে। পুবাকাশে সুর্য উঠতে শুরু করেছে। সেদিন সুর্যোদয় দেখলাম। সাতটার দিকে স্বাভাবিক হয়ে ঘুমালাম। আল্লাহ তুমি মহান। আমি বেঁচে আছি। অবাক লাগছে। শুকরিয়া হাজারো। 

আজকের দুঃখগাঁথাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু ভাই আগুনে পুড়ে মারা গেছেন আজ। আহা! নিয়তি। টগবগে ছেলেটা পুড়ে মারা গেল। মাত্র ক,মাস পরে নিজেও। তার স্ত্রী-র কথা ভাবতে পারছি না। বেঁচে থেকে তিনি কি করবেন৷ কিভাবে বাঁচবেন৷ তিনি কি আর কোনদিন স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারবেন। তবুও বাঁচতে হবে।  মনকে বোঝাতে হবে । 

ফলে নিশ্বাসের বিশ্বাস নাই এ কথার ভিত্তি নাই। বাঁচতে হলে নিশ্বাসেই বিশ্বাস করুন। 

আজও ৪৪ জন মারা গেছেন করোনায়। উপসর্গ নিয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তারা তো হিসাবের খাতাতেই নেই। জীবনকে ভালোবাসুন। নিশ্বাস কে বিশ্বাস করুন। 

জননেতা মোহাম্মদ নাসিম একজন আপাদমস্তক রাজনীতিক হঠাৎ করেই তিনিও চলে গেলেন। বিতর্ক ছাড়া মানুষ নেই। ফলে আসুন তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

হাসপাতালে গেলেন করোনা নিয়ে। মুক্তও হলেন, কিন্তু ফিরে এলেন না। 

আমাদের যা করা উচিতঃ সো প্রকৃতিকে বাঁচান। প্রকৃতিই আপনাকে বাঁচতে সহায়তা করবে। কোরোনা কোন জীবাণু অস্ত্র কিনা- তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।  তবে যদি তাই হয়! এরজন্য দায়ীকে নিশ্চয়ই প্রকৃতি কখনো ক্ষমা করবে না। মহাশক্তিধর!  মানুষ আজ কত অসহায়। ছোট্ট এক জীবাণুর  ভয়ে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে।  তাও বাঁচাতে পারছে না নিজেকে। পুরো বিশ্ব ই যেন ধরাশায়ী। 

দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। বাজেট হয়ে গেল। এরই মধ্যে। কে কি পেল তার হিসাব করে লাভ নেই। আমি জানি এ বাজেটে আমার জন্য কিছু নেই। এখন টিকে থাকাই যুদ্ধ।  বেঁচে থাকাও যুদ্ধ। আসুন নিজেকে প্রস্তুত করি। ইমিউনিটি গ্রো করি। হয় বাঁচবো, না হয় মরবো। এ কথাই সত্যি।

[লেখক: সাংবাদিক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।]

 

এশিয়ান টাইমস্/ এএসএস


এ জাতীয় আরো খবর