সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২০

ছাত্রলীগের করোনাকালীন ইতিবাচক ইমেজ অব্যাহত থাকুক

  • মুনতাসির সিয়াম
  • ২০২০-০৬-১৭ ০০:৪২:৪৫
image

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ছাত্র সগঠনের নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম ছাত্র সংগঠন এটি। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। জন্ম থেকেই ছাত্রলীগ নামের সংগঠনটির ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় গাঁথা আছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১১ দফা আন্দোলন সহ বাংলাদেশ পরবর্তী সময়েও এর ইতিবাচক কার্যক্রমগুলো সত্যিই অনস্বীকার্য। এমনকি মুক্তিযুদ্ধেও ছাত্রলীগের ভূমিকা প্রশংসনীয়। সে সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য তারা গড়ে তুলেছিল মুজিব বাহিনী এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মী। কাজেই শুরু থেকেই ছাত্রলীগের ইমেজ সাধারণ মানুষের কাছে ছিল আস্থার প্রতীক হিসেবেই।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিবেচনায় ছাত্রলীগ তাদের এই সুন্দর ইমেজটি যে খুইয়ে বসেছিল, তা আর বলার অবকাশ রাখে না। তার পেছনে দায়ী মূলত ছাত্রলীগের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় নিয়োজিত ছাত্রলীগ ট্যাগ লাগিয়ে রাখা সুবিধাভোগী কিছু নেতাকর্মীরাই। যারা দলের সুসময়ে এসে কিছু সুবিধা ভোগ এবং দল ও সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য নিরলস ভাবে ঘৃণ্য কার্যক্রমগুলো করে এসেছে দিনের পর দিন। তবে এক্ষেত্রে যে সেই সুবিধাভোগীদেরই পুরোপুরি দোষ তা বললে ভুল হবে। বরং বঙ্গুবন্ধুর আদর্শ বহন করে চলা একটি সংগঠনের প্রকৃত নেতা কর্মীদের কিছুটা অবহেলাও এখানে উল্লেখযোগ্য। যেখানে একটু সময় নিয়ে যাচাই বাছাই করার মধ্য দিয়ে সংগঠনের সদস্য নির্বাচন করলেই সুবিধাভোগীরা প্রবেশের সুযোগ হারায়। এত বড় একটি সংগঠনে দেশের আনাচে- কানাচে থেকে উঠে আসা কর্মীদের যাচাই বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিও যথেষ্ঠ কঠিনই বলা যেতে পারে। কিন্তু তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দলের ভাবমূর্তি ও সংগঠনের ইতিহাস অক্ষুন্ন রাখতে এটুকু দায়িত্ব সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা প্রয়োগের মাধ্যমে পালন করতে হবে বাধ্যতামূলক ভাবেই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে শাখা ইউনিটগুলো। এখান থেকেই বন্ধ করতে হবে যাকে- তাকে যখন- তখন সংগঠনে অবাধে প্রবেশের সুযোগ। সুষ্ঠু রাজনৈতিক জ্ঞান চর্চা কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলতে হবে প্রকৃত নেতা কর্মী।

কেননা, দেশজুড়ে খবরের পাতায় ইতিহাস জয়ী একটি সংগঠনের পরিচয় বহন করে চলা কোন কর্মীর ধর্ষণ, মারামারি সহ একের পর এক কুকর্মমূলক সংবাদ প্রকাশিত হওয়া, সংগঠনের জন্য যতটা লজ্জাজনক; একইভাবে লজ্জাজনক দেশবাসীর জন্যও। যে সংগঠন নীতি বহন করে শিক্ষা, শান্তি এবং প্রগতির, সেই সংগঠনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেই নিজেদের মধ্যে কথায় কথায় মারামারির মত ঘটনাগুলো শিক্ষালয়কে কলুষিত করে তোলে অবিরত। হ্যাঁ, এখানে অসংখ্য নেতা কর্মী থাকতেই পারে। ব্যক্তিভেদে মতভেদ থাকাও খুবই স্বাভাবিক। হতে পারে তাদের মতের অমিল বা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিন্ন পন্থা অবলম্বনের প্রশ্ন চলে আসে, কিন্তু সংগঠনের প্রত্যেকটি সদস্যের উদ্দেশ্য একটাই এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না। তা হলো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা, যা সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে; তার কাণ্ডারী হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা। আর যাই হোক, যে মুজিব সেনারা দেশ থেকে পাকবাহিনী তাড়িয়েছে, সেই একই সংগঠনের সদস্যদের নামে অপরাধমূলক কোন কর্মকান্ডের অভিযোগ আসা মানানসই নয়। মানানসই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলগুলো থেকে এক জোট হয়ে শিবির কর্মীদের বিতাড়িত করে শিবিরের কালো অধ্যায় রুখে দেয়া কর্মীদেরই, নিজেদের মধ্যে হল নিয়ে মারামারির মত ঘটনাগুলো ঘটিয়ে বেড়ানো। এক্ষেত্রে নিজ নিজ জায়গা থেকে শুধুমাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক নিয়মকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করলেই এরকম ঘটনাগুলো এড়ানো সম্ভব বলা যেতে পারে।

তবে বর্তমান করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিগত কয়েক বছরের কালো ইতিহাস থেকে যেন আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সক্ষম হয়েছে সংগঠনের নেতা কর্মীরা। দেশজুড়ে যে সংগঠনের নেতা কর্মীদের নামে ভুলভাল কাজের খবরে উপচে পড়তো সংবাদপত্রগুলো, সেখানেই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইতিবাচক সব খবরগুলো। ছাত্রলীগ গরীব কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছে, অসহায়দের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করছে, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের জানাজা ও দাফন কাজ করছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক বিতরণ করছে, হাসপাতালে রোগী পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করছে, বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে বৃক্ষরোপন কর্মসূচী পালন করছে আরও কত কি! সংগঠনের পাশাপাশি নেতা কর্মীরা নিজ উদ্যোগেও এগিয়ে আসছে নিজ নিজ সাধ্য মত। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে নিজেরাও। কিন্তু তবুও মানুষের জন্য কাজ থেমে নেই তাদের। 

এক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকাও ভুলে গেলে চলবে না। যদিও একটি প্রশ্ন ওঠে এক্ষেত্রে যে আমরা আমাদের ভূমিকায় কতটা সম মনোভাবাপন্ন। ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের মাধ্যমে গৃহীত খারাপ সংবাদগুলোতে যেমন আমাদের প্রতিবাদ তীব্র হওয়া বাঞ্চনীয়। একইভাবে তাদের ভালো কার্যক্রমগুলোতেও তীব্র ভাবে প্রশংসা করাটাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। হতে পারে সংগঠনের ওপর থেকে সাধারণের আস্থা হারিয়ে ফেলার পেছনে দীর্ঘদিন যাবত সংগঠনটির নাম নিয়ে চলা কিছু কর্মীদের খারাপ সংবাদগুলোই দায়ী এর জন্য। কিন্তু এদিকটাও ভেবে দেখতে হবে, ভালো কাজের প্রশংসার মধ্য দিয়েই মানুষ আরও বেশি ভালো কাজ করার প্রতি আগ্রহ খুঁজে পায়। আমাদের প্রশংসার পরিপ্রেক্ষিতে যদি সত্যিই এমনটা হয় তাহলে লাভটা যে দেশ ও মানুষেরই এটুকু বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না। আবার এদিকটাও ভেবে দেখতে হবে, ছাত্রলীগ ব্যাতীত ফেসবুকের বাইরে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের ভূমিকাই বা এই সময় কতটা সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে। এখন অন্তত এমন কোন অভিযোগ করার সুযোগ নেই, যেখানে কেউ বলতে পারে ছাত্রলীগের কর্মীদের দাপটে ক্যাম্পাস বা কর্মাঞ্চলে প্রবেশ করতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন তারা।

সবশেষে এটুকুই বলতে পারি, বিভিন্ন কারণে ছাত্রলীগ তাদের যে সুনাম হারিয়েছিল সেটা বর্তমান সময়ে এসে ঘুচতে শুরু করেছে কিছুটা। এই ধারা একইভাবে অব্যাহত থাকলে হয়তো একদিন আবারও জনমনে ছাত্রলীগের প্রতি আস্থা ফিরে আসতে শুরু করবে। আর এই আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে হবে সংগঠনের নিজ নেতা কর্মীদেরই। করোনা ভাইরাসের দিনগুলো ফুরালেও যেন না ফুরায় তাদের বর্তমান সময়ে দেশজুড়ে পরিচালনা করা ইতিবাচক কার্যক্রমগুলোর মত এক একটি উদাহরণ। সেইসঙ্গে নেতা কর্মীদের হয়ে উঠতে হবে আরও বেশি সচেতন ও সাংগঠনিক, যেন করোনা পরবর্তী সময়গুলোতে পূর্বেকার মত গৃহীত কোন অপরাধমূলক ঘটনাই আবার সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশের মত পরিস্থিতির জন্ম না হয়। তবেই হারানো ইতিবাচক ইমেজ সংগঠনের সঙ্গে পুনরায় শতভাগ যুক্ত হওয়ার পথ উন্মোচন হতে পারে।

[লেখক: মুনতাসির সিয়াম
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।]

[মতামতের লেখা লেখকের একান্তই নিজস্ব]

 

 

এশিয়ান টাইমস্/এমজেডআর


এ জাতীয় আরো খবর