শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২০

সাংবাদিকদের প্রতি প্রকাশকের খোলা চিঠি

  • খন্দকার সোহেল
  • ২০২০-০৬-১৮ ২৩:০৬:৪৯
image

পোস্টটি বন্ধুতালিকায় থাকা অগ্রজ সাংবাদিক, প্রাক্তন সহকর্মী ও সমসাময়িক সাংবাদিক বন্ধুদের জন্য। পোস্টটি বইপ্রেমী পাঠকের জন্যও। প্রকাশকদের জন্য তো অবশ্যই। আবার লেখকদের জন্যও।

আপনারা যারা প্রকাশনা জগতের অল্প-বিস্তর খোঁজখবর রাখেন তারা হয়তো এরইমধ্যে জেনে গেছেন করোনার দুর্যোগকাল কতটা ভয়াবহভাবে হানা দিয়েছে প্রকাশনা সেক্টরে। 

কাঁটাবনে প্রয়াত প্রকাশক ফয়সল আরেফীন দীপনের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত বুকক্যাফে 'দীপনপুর' বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

একইসঙ্গে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে 'কবিতাক্যাফে'। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কনকর্ড মার্কেটের পাঠকপ্রিয় বইয়ের দোকান 'মধ্যমা'। কাঁটাবনের 'নালন্দা'ও বন্ধ হতে চলেছে। জানতে পেরেছি, কাঁটাবন থেকে আরও বেশ কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাদের আউটলেট বন্ধ করে দিবেন। নীলক্ষেতের পুরাতন বইয়ের দোকান 'মোস্তফা বইঘর' বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক থেকেই জেনেছি একজন প্রকাশক তার প্রতিষ্ঠানের একমাত্র কম্পিউটার বিক্রি করে দিয়েছেন সংসারের খরচ মেটাবার জন্য।

না গণমানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে এই মানবিক খবরগুলো আসে না। অথচ অমর একুশে গ্রন্থমেলায় এই গণমাধ্যমের প্রচারণা চোখে পড়ার মতো! আপনারা যারা এই মাধ্যমে কাজ করেন আপনাদের কি মনে হয় না ক্যামেরার ল্যান্সটি বাকি ১১ মাসে দুয়েকবারের জন্য হলেও এই সেক্টরে ঘোরানো উচিত! আপনাদের কলম বইমেলা এলেই সচল হয়ে ওঠে। অথচ বাকি ১১ মাস মাথা কুটে মরলেও এই সেক্টরের সমস্যা নিয়ে কিছু বললে আপনাদের সাড়া পাওয়া যায় না!
কিন্তু কেন?

ফেব্রুয়ারি এলে তো মনে আপনারা যতটা না সাংবাদিক তার চাইতে অধিক বইপ্রেমী!

শুনলে খারাপ লাগলেও সত্য এটাই, আমাদের দেশের গণমাধ্যম সৃজনশীল প্রকাশনাকে একটি সিজনাল ব্যবসায়ে পরিণত করে ফেলেছে বলে অনেকে মনে করেন! 

তবুও গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ও আস্থা সাংবাদিকতার প্রতি, সাংবাদিকদের প্রতি। চারদিকে যখন ক্রমাগত দুর্নীতি, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতায় মানুষ ক্রমাগত অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে তখন সাংবাদিকদের প্রতি আস্থা রাখতে চায়। অন্ধকার সুড়ঙ্গপথের শেষপ্রান্তে এক ফোঁটা আলোর রেখা হিসেবেই এই পেশাকে এখনও মানুষ কল্পনা করে!

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু,

করোনাকালে ঠিক যে সময়টায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের প্রকাশনা সেক্টর একই সময়ে চলছে একটি বিরাট দুর্নীতির পায়তারা! বাংলাদেশের সকল প্রকাশকের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বাৎসরিক বাজেট ১-২ কোটি টাকা এবং এই বাজেটের বইক্রয় হয় অসংখ্য নিয়মকানুন মেনে। অথচ একটি চক্র প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বইক্রয়ের কার্যাদেশ তৈরি করা হচ্ছে আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে!! আমরা জেনেছি অনুর্ধ্ব ১০টি প্রতিষ্ঠানের বই দিয়ে এই কার্যাদেশ তৈরি করা হচ্ছে! জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বা পাবলিক লাইব্রেরিতে এক বছরে একজন প্রকাশকের কাছ থেকে বই কেনা হয় প্রতি বইয়ের ৬৫ কপি করে। অথচ এই সাপ্লাইয়ে বই কেনা হবে প্রতিটি বই ৬৫ হাজার কপি!! ভাবা যায়! কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো বইবাছাই নেই, কোনো কমিটি নেই... শুধু একটি চক্র আছে। একটি লোলুপ গোষ্ঠী আছে! এই গোষ্ঠী স্বাধীনতাপরবর্তীকালে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার পাঠকবান্ধব স্রোতের গতিপথটাই বদলে দিয়েছে।

পাঠকের জন্য বইপ্রকাশ না হয়ে বইপ্রকাশ হতে থাকল সাপ্লাইয়ের জন্য। বইপ্রকাশের উদ্দেশ্য হয়ে উঠল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাপ্লাই দেয়া। রাতারাতি অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের বড়ো বড়ো পদবীধারীরা লেখক হয়ে উঠলেন। লেখক বনে গেলেন মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক নেতা, ব্যাংকার... ছাত্রলীগের নেতারাও বাদ গেলেন না। কারণ পাওয়ার আছে যাদের হাতে তাদের বই প্রকাশ মানেই পোয়াবারো! আপনারা যদি বিগত পাঁচ বছরে শুধু প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দিকেই দৃষ্টি ঘোরান তাহলে দেখবেন, এই দপ্তর থেকে চিঠি চালাচালি করে কত শত কোটি টাকার বই সাপ্লাই হয়েছে! এবং বইগুলো কোন কোয়ালিটির! কারা করেছে কাজগুলো! এই সাপ্লাইবাজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেল বইয়ের দাম। কারণ পাঠক না কিনলেও এইসব বই সাপ্লাইয়ে চলে যাবে! 

প্রিয় বইপ্রেমী,
বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার বিষফোঁড়া হিসেবে চিহ্নিত এই সাপ্লাইবাজ সিন্ডিকেটের হাত থেকে সৃজনশীল প্রকাশনাকে প্রকাশনার স্বাভাবিক গতিপথে ফিরিয়ে আনতে সকলের সজাগ হওয়া প্রয়োজন। 'মুক্তধারা' কিংবা 'সেবা' প্রকাশনী যেভাবে দেশে পাঠকশ্রেণি তৈরি করেছে, পাঠকবান্ধব বই প্রকাশনা করেছে সেই অবস্থান ফিরিয়ে আনতে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে। আসুন সচেতন হই। সাপ্লাইমুখি প্রকাশনার বদলে প্রকাশনাকে পাঠকমুখি করে তুলতে সোচ্চার হই।

পুনশ্চ : প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যে দুর্নীতির কথা বললাম, যে দুর্নীতি বন্ধের জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি সমিতির পক্ষ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে, সেই দুর্নীতি বন্ধে সাংবাদিকদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
আমরা এখনও বিশ্বাস করি, আমাদের গণমানুষের জন্য আমাদের গণমাধ্যম এখনও তৎপর ও সজাগ। এই দুর্নীতি নিয়ে অনেককে ইনবক্স করেছিলাম, গণমুখী সাংবাদিকতা যারা করেন তাদের সহযোগিতাও পেয়েছি। আশা করি, অন্যরাও বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে আসবেন। 

সাপ্লাইবাজদের এই রাহুগ্রাস থেকে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা সেক্টরটিকে বাঁচাতে সবার প্রতি আকূল আবেদন।

[লেখক: প্রকাশক, ভাষাচিত্র।]

 

এশিয়ান টাইমস্/ এমআরআর


এ জাতীয় আরো খবর