সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২০

চীনকে অভিনন্দন: শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুবিধা বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন

  • ফজল মুকিম খান
  • ২০২০-০৬-১৯ ২১:১৮:৩৩
image

বাংলাদেশ আগে থেকে চীনে [Asia Pacific Trade Agreement (APTA)] এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপটা) আওতায় ৩ হাজার ৯৫ পণ্যের শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা ভোগ করে আসছে। আর এবার চীনের বাজারে রপ্তানিতে বাংলাদেশে তৈরি আরও ৫ হাজার ১৬১ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়েছে। আর এটাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জও। 

কারণ চীন যেসব পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা অতীতে দিয়েছিল বা আগামীতে দিতে যাচ্ছে এসব পণ্যে খুব কমই উৎপাদিত হয় আমাদের দেশে। ফলে চীনে রপ্তানী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষ করে নিজেদের সক্ষমতা তৈরির দিকে নজর দিতে হবে সবার আগে। বাংলাদেশের সামনে রপ্তানির যে সুযোগ উকি দিচ্ছে তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর এখনই সময়। ফলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে, এলডিসি কান্ট্রি হিসাবে বাণিজ্যের ওই প্রাধিকারটি পেতে দীর্ঘ দিন ধরে ঢাকা-বেইজিং আলোচনা চলছিল। গত ১৬ জুন সুবিধাটি দিতে সম্মত হয় শি জিন পিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। যদিও বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লিফট বা সিঁড়িতে রয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে বেইজিং প্রদত্ত সুবিধার ওই ঘোষণা কার্যকর হতে যাচ্ছে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শুল্ক পণ্যের ৯৭ শতাংশে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিল চীন সরকার। আগে থেকে এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপটা) আওতায় ৩ হাজার ৯৫ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা আগে থেকে ভোগ করে থাকে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে ৮ হাজার ২৫৬ পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিল চীন সরকার। তাই অভিনন্দন শি জিন পিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারকে। 

পাশাপাশি বাংলাদেশ যে ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি বা অর্থনৈতিক কূটনীতি চালু করেছে, এটা সেদিক থেকে খুব বড় একটা অর্জন। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকেও জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও মোবারকবাদ।

চীন সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির বাজারে বাংলাদেশ যত পণ্য পাঠাবে তার ৯৭ শতাংশই শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এটাকে এক অর্থে শতভাগ শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধাও বলা হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ থেকে যত ধরনের পণ্য চীনে রফতানি হয় তার মধ্যে মাত্র তিন শতাংশ বাদে সবই বিনাশুল্কে দেশটির বাজারে ঢুকতে পারবে।

বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে থাকলেও স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাণিজ্যের ওই প্রাধিকারটি পেতে দীর্ঘদিন ধরে দুদেশের আলোচনা চলছিল। বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ সুবিধা দেওয়ার অনুরোধ করে চীন সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়। এ অনুরোধের প্রেক্ষিতে চীনের স্টেট কাউন্সিলের কাস্টমস ট্যারিফ কমিশন সম্প্রতি এ সুবিধা প্রদান করে নোটিস জারি করে।

যদিও ২০১৬ সালে পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ-চীনের সাথে ৮৮৫ কোটি ডলারের যে বাণিজ্য ঘাটতি। নতুন করে দ্বিপক্ষীয় সুবিধাপ্রাপ্তির ফলে চীনে বাংলাদেশের মোট রফতানি পণ্যের ৯৭ শতাংশই শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় এলো। যা এই বিশাল ঘাটতি কমাবার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমরা মনে করি।

এদিকে ২০১৯ সালের ২০ জুন জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ২৮৪ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরমধ্যে চীনের সাথে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, পরিমাণ ১১ হাজার ১১ মিলিয়ন। এরপরই রয়েছে ভারতের অবস্থান। ঘাটতির পরিমাণ ৭ হাজার ৭৪৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। 

ওই সময় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বাণিজ্য ঘাটতির অবসান ও গ্রাস করতে এসব দেশের সাথে রপ্তানী বৃদ্ধির লক্ষে নেওয়া পদক্ষেপসমুহ সবিস্তারে তুলে ধরেন। আমরা চাই বাণিজ্যে এই ঘাটতির অবসানে বাণিজ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপসমূহের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন।

যদিও এর আগে ২০১৬ সালে ১৫ অক্টোবর প্রায় তিন দশক পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অনেকগুলো বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতার চুক্তি হয়েছিল। তখন চীনের রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল বিনিয়োগ ও বাণিজ্য। ওই সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সরকারী পর্যায়ে ২৭ টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বেসরকারী পর্যায়েও ১৩ টি চুক্তি হয়েছে। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বেশ বড়। ওই সময়ে দুইদেশের মধ্যে টাকার অংকে ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৮৫ কোটি ডলার।

মি. শি-র ওই সফরে চীন বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ঋণ দেয়ার বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। যার বেশিরভাগই ছিল অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে। চুক্তির খুটিনাটি বিষয়গুলো এবং সেগুলো বাংলাদেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করছে সেটিও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং বিনিয়োগের সুফল নেয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল নি:সন্দেহে।

ওই সময় চীন যে বিনিয়োগ করছে, তার ফলে অন্যান্য বড় দেশও আস্থা কুড়াতে আমরা কিছুটা ব্যর্থ হয়েছি এটা বলাই যায়। যদিও চীন বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে যাচ্ছে। তবে এসব পণ্যের খুব কমই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। চীনে রপ্তানী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজেদের সক্ষমতা তৈরির দিকে নজর দিতে হবে। সরকারকেও রপ্তানীমুখী এসব শিল্প স্থাপনে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে দেশের শিল্পোদ্যক্তাদের। তবেই আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌছাতে সক্ষম হব।

[পাদটিকা: চীনে গত ডিসেম্বরে প্রথম করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী এ মহামারি ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে কমপক্ষে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আর এই জন্য বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিনিরা চীনকেই দোষছেন। আর এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ৫৭ জনে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশেও হু হু করে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। যার কারণে থমকে গেছে গোটা বিশ্ব।]

[লেখক: সম্পাদক, এশিয়ান টাইমস্]

 

 

এশিয়ান টাইমস্/ এমআরআর


এ জাতীয় আরো খবর